কিডনির দাম কেমন পাওয়া যায়? বাস্তবতা, আইন এবং মানবিক দিক
কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজন কেন হয় এবং বাংলাদেশে কিডনি কেনাবেচা নিয়ে বাস্তব চিত্র
বর্তমান সময়ে কিডনি রোগ একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে হাজার হাজার মানুষ কিডনি বিকল হওয়ার কারণে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের অপেক্ষায় থাকেন। এই অবস্থায় অনেক মানুষ জানতে চান, কিডনির দাম কেমন পাওয়া যায় বা কেউ যদি কিডনি দিতে চায় তাহলে কীভাবে দেওয়া যায়।
বাস্তবে কিডনি কেনাবেচা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন কিডনি বিক্রি করে বড় অংকের টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অধিকাংশ দেশেই কিডনি বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ এবং এটি একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই প্রতিবেদনে কিডনির দাম, কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজন, বাংলাদেশে আইন এবং মানবিক দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

কিডনি কেন প্রয়োজন হয়
মানব শরীরে দুটি কিডনি থাকে। কিডনির প্রধান কাজ হলো রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করা এবং শরীরের পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখা।
যখন কিডনি সঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখন সেটিকে কিডনি ফেইলিওর বলা হয়। তখন রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য দুটি উপায় থাকে।
প্রথমত ডায়ালাইসিস
দ্বিতীয়ত কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট
ডায়ালাইসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও এটি রোগীর জন্য কষ্টকর এবং ব্যয়বহুল। তাই অনেক রোগী শেষ পর্যন্ত কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সিদ্ধান্ত নেন।
কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট কী
কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হলো একটি অপারেশন যেখানে সুস্থ একজন মানুষের কিডনি নিয়ে অসুস্থ রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।
সাধারণত নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে কিডনি নেওয়া হয়। যেমন
-
বাবা
-
মা
-
ভাই
-
বোন
-
স্বামী
-
স্ত্রী
এদের মধ্যে যদি কারো কিডনি রোগীর সাথে ম্যাচ করে, তাহলে ডাক্তাররা ট্রান্সপ্লান্টের অনুমতি দেন।
কিডনির দাম কত পাওয়া যায় এই ধারণা
অনেক মানুষ মনে করেন কিডনি বিক্রি করলে কয়েক লাখ বা কয়েক কোটি টাকা পাওয়া যায়। বাস্তবে এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুজব।
বিভিন্ন দেশে অবৈধ কিডনি বাজার থাকলেও সেখানে সাধারণ মানুষ অনেক সময় প্রতারণার শিকার হন।
কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে অবৈধ বাজারে অনেক সময় ডোনারকে ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকার মতো অর্থ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই অর্থের বেশিরভাগই দালাল চক্র নিয়ে নেয়।
অনেক ক্ষেত্রে ডোনাররা প্রতিশ্রুত অর্থও পান না।
বাংলাদেশে কিডনি বিক্রি কি বৈধ
বাংলাদেশে মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন অনুযায়ী কিডনি বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ।
আইন অনুযায়ী
-
কিডনি কেনাবেচা করা যাবে না
-
দালালি করা যাবে না
-
অর্থের বিনিময়ে অঙ্গ দেওয়া অপরাধ
তবে নিকট আত্মীয়রা মানবিক কারণে কিডনি দান করতে পারেন।
এই আইন ভঙ্গ করলে কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করতে কত খরচ হয়
বাংলাদেশে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের খরচ হাসপাতাল অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণভাবে খরচ হয়
৩ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত
এই খরচের মধ্যে থাকে
-
অপারেশন খরচ
-
পরীক্ষা নিরীক্ষা
-
হাসপাতালের বিল
-
ওষুধ
তবে ট্রান্সপ্লান্টের পর রোগীকে সারাজীবন কিছু ওষুধ খেতে হয়, যার মাসিক খরচ ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
কিডনি দানের পর ডোনারের কী সমস্যা হতে পারে
অনেকে ভাবেন কিডনি দিলে মানুষ বাঁচতে পারে না। বাস্তবে একজন সুস্থ মানুষ একটি কিডনি দিয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
তবে কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হয়।
যেমন
-
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
-
সঠিক খাদ্যাভ্যাস
-
ধূমপান বা মাদক থেকে দূরে থাকা
-
পর্যাপ্ত পানি পান করা
ডাক্তারদের মতে সুস্থ ডোনারের ক্ষেত্রে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা হয় না।
অবৈধ কিডনি ব্যবসার ঝুঁকি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈধ কিডনি ব্যবসা একটি বড় সমস্যা।
এই চক্র সাধারণত দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে। তাদের বড় অংকের টাকার লোভ দেখানো হয়।
কিন্তু বাস্তবে
-
প্রতিশ্রুত টাকা দেওয়া হয় না
-
সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হয় না
-
অনেক সময় ডোনারের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়
এই কারণে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
মানবিক দৃষ্টিকোণ
কিডনি দান একটি মানবিক কাজ। অনেক সময় একজন ডোনারের কারণে একজন রোগীর জীবন বাঁচতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশে স্বেচ্ছায় অঙ্গ দানের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অনেক মানুষ মৃত্যুর পর অঙ্গ দানের অঙ্গীকার করেন।
বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই সচেতনতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
চিকিৎসকরা বলেন কিডনি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।
কারণ
-
সব ডোনারের কিডনি দেওয়া নিরাপদ নয়
-
সব রোগীর সাথে কিডনি ম্যাচ করে না
-
অনেক মেডিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন হয়
তাই কোনো দালাল বা অবৈধ চক্রের সাথে যোগাযোগ না করে বৈধ হাসপাতালের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
কিডনির দাম নিয়ে সমাজে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। বাস্তবে কিডনি কেনাবেচা আইনত নিষিদ্ধ এবং এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধমূলক কাজ। কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সঠিক পদ্ধতি হলো নিকট আত্মীয়দের মাধ্যমে বা বৈধ চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় কিডনি দান করা। সচেতনতা বাড়ানো এবং আইন মেনে চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে কিডনি রোগীদের জন্য নিরাপদ পথ।
ছাত্রনেতা মুজিব আরএসএম বলেন, সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে যাতে কেউ অবৈধ অঙ্গ ব্যবসার শিকার না হয় এবং মানবিকভাবে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে।



