কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হলো আজ। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অবৈধ দখলে থাকা সুগন্ধা সৈকত অবশেষে দখলমুক্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনার পর ব্যবসায়ীরা নিজেরাই তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে শুরু করেন। এর ফলে সমুদ্র সৈকতের মূল বালিয়াড়ি তার আদি রূপ ফিরে পেতে শুরু করেছে।
প্রশাসনের অভিযান ও ব্যবসায়ীদের পদক্ষেপ
রবিবার সকাল থেকেই কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের দোকান ও মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেন। সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ির ওপর গড়ে ওঠা প্রায় পাঁচ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা অপসারণের মাধ্যমে সৈকতের বিশাল এলাকা উন্মুক্ত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, পর্যটন নগরীর শৃঙ্খলা রক্ষা এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে জেলা প্রশাসন থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, রবিবার সকাল ১০টার মধ্যে সকল অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে দুপুর ২টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে মাইকিং করে এলাকা ছাড়ার চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের উপস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা দ্রুততার সাথে তাদের টিন, কাঠ এবং মালামাল সরিয়ে নিয়ে যান।
ক্ষতির মুখে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
দীর্ঘদিন ধরে এই সৈকত পয়েন্টে ব্যবসা করে আসছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। হঠাত এই উচ্ছেদ অভিযানে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। বিশেষ করে আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে অনেক ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছিলেন। ঝিনুক বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে আমরা সম্মান জানাই, তাই নিজেরাই দোকান সরিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু মনের ভেতরে এক গভীর কষ্ট রয়ে গেছে। ঈদের আগে ভালো ব্যবসার আশায় ধার-দেনা করে দোকানে মালামাল তুলেছিলাম। এখন উচ্ছেদের ফলে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছি। এই ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে তা কেবল আল্লাহই জানেন।’
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের জন্য বিকল্প কোনো জায়গার ব্যবস্থা করলে পর্যটন নগরীর সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি তাদের জীবন-জীবিকাও নিশ্চিত হতো। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৈকতের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পর্যটকদের চলাচলের পথ সুগম করতে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া অপরিহার্য ছিল।
সৈকত রক্ষা ও পরিবেশগত গুরুত্ব
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সৈকত। কিন্তু গত কয়েক বছরে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টে অপরিকল্পিতভাবে দোকানপাট গড়ে ওঠায় সৈকতের সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ স্থাপনাগুলো সরানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এই উচ্ছেদ অভিযানের ফলে সৈকতের বাস্তুসংস্থান রক্ষা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সঠিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব নিয়ে আপনারা শিক্ষা ও সচেতনতামূলক তথ্য থেকে আরও জানতে পারেন।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক সতর্কতা
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মঞ্জু বিন আফনান গণমাধ্যমকে জানান, ব্যবসায়ীরা নিজেদের দায়িত্বেই স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছেন, যা প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, ‘সকালে তারা কিছুটা অতিরিক্ত সময় চেয়েছিলেন মালামাল সরানোর জন্য। আমরা তাদের মানবিক দিক বিবেচনা করে সময় দিয়েছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সুগন্ধা পয়েন্টের বড় অংশ পরিষ্কার হয়ে গেছে।’ তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, শুধুমাত্র সুগন্ধা নয়, পর্যায়ক্রমে লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টেও একই ধরনের অভিযান চালানো হবে। কোনোভাবেই সমুদ্রের বালিয়াড়িতে স্থায়ী বা অস্থায়ী কোনো স্থাপনা থাকতে দেওয়া হবে হবে না।
এই বড় ধরনের প্রশাসনিক উদ্যোগের খবরটি বর্তমানে জাতীয় সংবাদের অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পর্যটকরাও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আহসান হাবিব বলেন, ‘আগে সুগন্ধা পয়েন্টে নামলে মনে হতো কোনো ঘিঞ্জি বাজারে এসেছি। এখন দোকানগুলো সরে যাওয়ায় সমুদ্রের বিশালতা উপভোগ করা যাচ্ছে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পর্যটন উন্নয়ন
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সৈকত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে আধুনিক ওয়াশ ব্লক, বসার স্থান এবং আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সম্পর্কে পড়তে ভিজিট করুন লাইফস্টাইল বিভাগ। এছাড়াও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে অনেক ব্যবসায়ী সংগঠন এখন মানবিক কাজে এগিয়ে আসছে। জরুরি প্রয়োজনে রক্তদানের মতো মহৎ কাজে অংশ নিতে রক্তদান প্ল্যাটফর্মের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, উচ্ছেদকৃত এলাকায় পুনরায় যাতে কেউ দখল নিতে না পারে সেজন্য নিয়মিত মনিটরিং এবং টহল জোরদার করা হবে। পর্যটন পুলিশ ও বিচ কর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে বালিয়াড়িতে নতুন করে কোনো ঝুপড়ি দোকান গড়ে না ওঠে। কক্সবাজারকে একটি পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ ২০ বছরের জঞ্জাল পরিষ্কারের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যের দিকেই এগুচ্ছে দেশের প্রধান এই পর্যটন কেন্দ্র।
সংসদে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশন করার দাবি – লুৎফুর রহমান কাজল






১টি মন্তব্য