বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কক্সবাজার জেলা আমীর অধ্যক্ষ নূর আহমেদ আনোয়ারী বলেছেন, মাহে রমাদান কেবল উপবাস পালনের মাস নয়, বরং এটি মানুষের জীবনে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমূলক সমাজ গঠনের এক অনন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত পবিত্রতা অর্জনের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে ইনসাফ এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা করাই রমজানের মূল দর্শন। ২০২৬ সালের এই পবিত্র মাসে আমাদের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ করা।
রমাদানের মূল শিক্ষা ও সামাজিক প্রভাব
কক্সবাজার শহরের একটি মিলনায়তনে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অধ্যক্ষ আনোয়ারী উল্লেখ করেন যে, রমজান আমাদের সংযমের শিক্ষা দেয় যা আধুনিক বিশ্বের অনেক অস্থিরতা নিরসনে সহায়ক হতে পারে। তিনি বলেন, যখন একজন রোজাদার ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হন, তখন তিনি সমাজের দরিদ্র ও অনাহারী মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন। এই উপলব্ধি থেকেই সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবসেবার মানসিকতা তৈরি হয়।
এই নেতার মতে, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে ইনসাফের অভাব। তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-র বিভিন্ন প্রতিবেদনের উদাহরণ টেনে বলেন, বিশ্বের অনেক স্থানেই আজ ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মাহে রমাদানের আদর্শই হতে পারে বিশ্বশান্তির পথ।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান
বক্তব্যে তিনি বর্তমান বাজারের অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রমজান মাস আসার সাথে সাথেই একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিষিয়ে তোলে। এটি ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা মুনাফাখোরি ত্যাগ করে সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করেন। দেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মনে করেন।
অধ্যক্ষ নূর আহমেদ আনোয়ারী বলেন, সরকার ও প্রশাসনের উচিত রমজানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিশ্চিত করা। মাহে রমাদানের পবিত্রতা রক্ষা করতে হলে কালোবাজারি ও মজুদদারি বন্ধ করা অপরিহার্য। তিনি বলেন, জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত যেকোনো রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।
শিক্ষার গুরুত্ব ও নতুন প্রজন্মের ভূমিকা
শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, কেবলমাত্র জাগতিক শিক্ষা দিয়ে একটি সুশৃঙ্খল জাতি গঠন সম্ভব নয়। নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেম ও ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, যুব সমাজই একটি দেশের মূল শক্তি। রমজানের প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে যুবকদের উচিত মাদক, সন্ত্রাস এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। আদর্শিক সমাজ গঠনে তরুণদের জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার সমন্বয় ঘটাতে হবে। কক্সবাজারের মতো পর্যটন নগরীতে নৈতিকতা ও আতিথেয়তার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে যুবসমাজের অবদান অনস্বীকার্য।
আর্তমানবতার সেবা ও জাকাত ব্যবস্থা
বক্তব্যে তিনি ধনীদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা জাকাত ও সদকাহ প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ান। তিনি বলেন, যদি সঠিকভাবে জাকাত ব্যবস্থা কায়েম করা যায়, তবে সমাজে কোনো অভাবী মানুষ থাকবে না। কক্সবাজার জেলা জামায়াত এ লক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং আর্তমানবতার সেবায় তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
তিনি জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে দেশের স্বার্থে এবং ইসলামের স্বার্থে আমাদের সকলকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। রমজান আমাদের এই ঐক্যের শিক্ষা দেয়। যখন ইফতারের সময় সবাই একসাথে বসে আহার করি, তখন কোনো ভেদাভেদ থাকে না—ঠিক এভাবেই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমতা আনতে হবে।
পবিত্রতা রক্ষা ও শেষ দশকের প্রস্তুতি
মাহে রমাদানের শেষ দশকে ইতিকাফ ও শবে কদরের গুরুত্ব বর্ণনা করে তিনি বলেন, আল্লাহর নৈকট্য লাভের এই সুযোগ আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়। রমজানের শেষার্ধে আরও বেশি ইবাদত এবং সমাজ সংস্কারের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে। তিনি কক্সবাজারের সকল মসজিদের ইমাম ও ওলামায়ে কেরামকে রমজানের সঠিক মাসআলা-মাসায়েল এবং সামাজিক গুরুত্ব সম্পর্কে মুসল্লিদের সচেতন করার অনুরোধ জানান।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রমজান পরবর্তী সময়েও এই শিক্ষার প্রতিফলন আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে রাখতে হবে। কেবল এক মাসের ইবাদত নয়, বরং সারাবছর যেন আমরা এই ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমূলক মানসিকতা ধরে রাখতে পারি, সেই দোয়াই তিনি করেন। পরিশেষে তিনি দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কামনা করেন।




১টি মন্তব্য