Educationশিক্ষা

কোচিং-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা: বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত

সৃজনশীলতা হারিয়ে কেবল মুখস্থ বিদ্যায় বন্দি শিক্ষার্থীরা; বিশেষজ্ঞ মহলে চরম উদ্বেগ ও আমূল পরিবর্তনের দাবি।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে শিক্ষার লক্ষ্য ছিল মানুষের মনকে মুক্ত করা, সৃজনশীলতাকে লালন করা এবং কোমলমতি শিশুদের একটি অর্থবহ জীবন ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, তা আজ কোচিং সেন্টারের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েছে। বর্তমান শিক্ষা কাঠামো এবং পরীক্ষা পদ্ধতির জটিলতায় শিক্ষার্থীরা এখন শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের চেয়ে কোচিং সেন্টারগুলোর ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মেধাশক্তিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বনাম বর্তমান বাস্তবতা

শিক্ষা কেবল কতগুলো তথ্য মুখস্থ করা বা পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার নাম নয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা আজ একটি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্য ডেইলি এশিয়ান এজ-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মুক্ত চিন্তার সুযোগ দেওয়ার বদলে তাদের মুখস্থনির্ভর করে তুলছে। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল গাইড বই এবং কোচিং ব্যবসা বন্ধ করা, কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। শিক্ষার্থীরা এখন সৃজনশীলতার নামে কোচিং থেকে সরবরাহ করা নির্দিষ্ট ছকে উত্তর তৈরি করতে শিখছে।

কোচিং সেন্টারের রমরমা ব্যবসা: রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলেও এখন অলিগলিতে কোচিং সেন্টারের আধিপত্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের তাদের নিজস্ব কোচিংয়ে আসতে বাধ্য করছেন। এতে করে দরিদ্র পরিবারের ওপর যেমন আর্থিক চাপ বাড়ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। যারা কোচিং করার সামর্থ্য রাখে না, তারা প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও শিক্ষার গুণগত মান

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান বলেন, “শিক্ষা মানে মেধার বিকাশ, কিন্তু বর্তমানের কোচিং-নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের যান্ত্রিক রোবটে পরিণত করছে। তারা পাঠ্যবই পড়ার চেয়ে শর্টকাট টেকনিক শিখতে বেশি আগ্রহী। এতে করে তাদের মৌলিক জ্ঞান অর্জনের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।” আরও পড়ুন: বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই কোচিং নির্ভরতা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং এটি একটি মানসিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অভিভাবকরাও মনে করছেন যে, কোচিং ছাড়া তাদের সন্তানরা ভালো ফলাফল করতে পারবে না। এই ভীতির সুযোগ নিয়ে শিক্ষা নিয়ে এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা তাদের যথাযথ পাঠদান থেকে বিমুখ হচ্ছেন, যা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

কোচিং-নির্ভর এই জীবন শিক্ষার্থীদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত তারা স্কুল, কোচিং এবং গৃহশিক্ষকের কাছে ব্যস্ত থাকে। তাদের খেলার মাঠ বা বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই। এই অতিরিক্ত চাপ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হতাশ এবং ক্লান্ত শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের আনন্দ হারিয়ে ফেলছে এবং কেবল পরীক্ষার ফলাফলের জন্য লড়াই করছে।

অর্থনৈতিক সংকট ও অভিভাবকবৃন্দের দুর্ভোগ

মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সন্তানদের কোচিং ফি দিতে। সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলোর বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচের বাইরে এই অতিরিক্ত খরচ পরিবারগুলোর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা তাদের মৌলিক প্রয়োজন কাটছাঁট করে সন্তানের শিক্ষার জন্য এই ব্যয় মেটাচ্ছেন, যা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ

বাংলাদেশের এই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে যাতে কোচিং করে বা মুখস্থ করে কেউ ভালো করতে না পারে। প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের জন্য ব্যবহারিক ও বিশ্লেষণমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।

উপসংহার: শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ড যদি বাণিজ্যিকীকরণ এবং কোচিং-নির্ভর হয়ে পড়ে, তবে জাতির উন্নয়ন অসম্ভব। মেধাবী প্রজন্ম গড়তে হলে আমাদের শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্যে ফিরে যেতে হবে। সরকার, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই পারে এই কোচিং-সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি আধুনিক ও সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। অন্যথায়, আমাদের আগামী প্রজন্ম কেবল ডিগ্রিধারী হয়ে গড়ে উঠবে, কিন্তু তাদের মধ্যে থাকবে না কোনো উদ্ভাবনী শক্তি বা প্রকৃত দেশপ্রেম।

BartaNow - বার্তানাও

বার্তানাও (BartaNow) একটি আধুনিক ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, খেলাধুলা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়। সঠিক ও নিরপেক্ষ সংবাদ পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button