মানবাধিকার

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি হুবহু আইনে পরিণত হওয়া উচিত: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

মানবাধিকার রক্ষায় অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ওপর আস্থা প্রকাশ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের; শিরদাঁড়া সোজা রেখে কাজ করার আহ্বান।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫-কে কোনো প্রকার পরিবর্তন ছাড়াই সরাসরি আইনে পরিণত করার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। ২০২৬ সালের ৯ মার্চ সোমবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সম্মেলনকক্ষে নবনিযুক্ত কমিশনারদের সঙ্গে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।

মানবাধিকার সুরক্ষায় নতুন অধ্যাদেশের কার্যকারিতা

সভায় বক্তারা বর্তমান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তারা মনে করেন, এই অধ্যাদেশটি কমিশনকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার এবং মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আইনি এখতিয়ার প্রদান করেছে। এই আইনি কাঠামোটি কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন। দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে এই ধরনের শক্তিশালী আইনের বিকল্প নেই।

ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ কমিশনকে মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত এখতিয়ার দিয়েছে। তাই এই অধ্যাদেশটি অপরিবর্তিত রেখেই পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হওয়া উচিত। এটি বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা মোকাবিলায় কমিশন আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান কমিশনের ওপর নাগরিক সমাজের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং তারা কমিশনের পাশে থেকে কাজ করতে আগ্রহী। জাতীয় সংবাদ বিভাগে এই ধরনের মানবাধিকার সংক্রান্ত আপডেটগুলো নিয়মিত গুরুত্ব পাচ্ছে।

শিরদাঁড়া সোজা রেখে কাজ করার আহ্বান

আলোচনা সভায় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “বর্তমান কমিশনের কমিশনারদের সঙ্গে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। আমি তাদের ব্যক্তিগতভাবে চিনি ও তাদের নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি। আমরা চাই, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের সঙ্গে বর্তমান কমিশনেরও ধারাবাহিকতা থাকুক।” তিনি কমিশনকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে কাজ করার পরামর্শ দেন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, মানবাধিকার কমিশনকে অবশ্যই শিরদাঁড়া সোজা রেখে কাজ করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।

তিনি আরও যোগ করেন যে, কোনো রাজনৈতিক বা বাহ্যিক চাপে কমিশন যেন তাদের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত না হয়। কমিশনের কমিশনারদের সততা এবং দক্ষতা দেশ ও জাতির জন্য এক বড় সম্পদ। নাগরিক সমাজ প্রত্যাশা করে যে, নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে এই কমিশন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ মানবাধিকার ও সুশাসনের প্রশ্নে বরাবরই সোচ্চার।

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা

সভায় নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধীসহ পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্য কমিশনের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, সমাজে যারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। কমিশনকে সেই সব মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে হবে। সামাজিক বৈষম্য দূর করতে মানবাধিকার কমিশনের সক্রিয়তা অপরিহার্য।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার প্রদানের ক্ষেত্রে কমিশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং টেকসই কর্মকৌশল প্রণয়ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নাগরিক সমাজ মনে করে, শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, বরং সেই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা পর্যন্ত কমিশনের সম্পৃক্ত থাকা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। যেমন রক্তদানের ক্ষেত্রে রক্তদান ও সমাজসেবা সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ায়, ঠিক তেমনি মানবাধিকার কমিশনকেও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় পাশে দাঁড়াতে হবে।

নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা ও সহযোগিতা

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বর্তমান কমিশনের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করেন, যদি অধ্যাদেশটি হুবহু আইনে পরিণত হয়, তবে তা কমিশনের কাজের ধারাবাহিকতা এবং বৈধতা আরও জোরালো করবে। বাংলাদেশের রাজনীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে মানবাধিকারের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার এটিই সেরা সময়।

মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে নবনিযুক্ত কমিশনাররা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান এবং তাদের দেওয়া পরামর্শগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন। তারা বলেন, জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কমিশন বদ্ধপরিকর এবং তারা সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সাথে কাজ করবেন। মানবাধিকার সুরক্ষা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয় এই সভায়।

সংসদের আগামী অধিবেশনে এই অধ্যাদেশটি পাস করার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে বিশেষ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মানবাধিকার সুরক্ষার এই আন্দোলনকে বেগবান করতে হলে আইনি ভিত্তিটি মজবুত হওয়া প্রয়োজন। সকল মহলের দাবি এখন একটাই—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ যেন কোনো কাটছাঁট ছাড়াই দ্রুত আইনে রূপান্তরিত হয়।

আরও পড়ুনঃ রক্তদাতা ও গ্রহীতার সেতুবন্ধনে ‘রক্তদাও’: জীবন বাঁচানোর এক অনন্য ডিজিটাল উদ্যোগ

একটি উত্তর দিন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button