বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে কক্সবাজারের কলাতলীর বাইপাস সড়কে অবস্থিত গ্যাসপাম্পে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে। এদিন কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবীবিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজলকে ফোন করে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হয়। ফোনালাপে গ্যাসপাম্পে বিস্ফোরণ, আগুনে দগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অবস্থা, প্রশাসনের তৎপরতা এবং তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল জানান
বৃহস্পতিবার রাতে কলাতলীর বাইপাস সড়কে অবস্থিত গ্যাসপাম্পে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাওয়া হয়। তিনি জানান, বিস্ফোরণের কারণ, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের তৎপরতা, আহতদের চিকিৎসা এবং তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। পরিস্থিতির সার্বিক বিবরণ দেওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থেকে মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় সংঘটিত এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলমকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান মো. শাহিদুল আলম জানান, ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দল, বিস্ফোরণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন, “ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কাজ করছি। সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
তদন্ত কমিটির কাজের পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থল ঘিরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পাম্পটির আশপাশ থেকে অনেক আলামত সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পাম্পের চারপাশে পিলার বসিয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা চলছে এবং পুরো এলাকা পরিচ্ছন্ন করার কাজও চলছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বৃহস্পতিবার রাতেই মালিকপক্ষ দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন আলামত অন্যত্র সরিয়ে ফেলে এবং সংস্কারের প্রস্তুতি শুরু করে। তাদের দাবি, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই যদি আলামত সরিয়ে ফেলা হয়, তাহলে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলমকে অবহিত করা হলে তিনি বলেন, “আলামত সরিয়ে কোনো লাভ হবে না। তদন্তের স্বার্থে যা সংরক্ষণ প্রয়োজন, তা সংরক্ষণের জন্য লিখিতভাবে মালিকপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় আলামতের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকার বাইরে কিছু সরানো বা নষ্ট করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ব্যত্যয় বরদাশত করা হবে না।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার সন্ধ্যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজ শুরু হয়। প্রথমে কর্মচারীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে বালু ও পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা আশপাশের ঘরবাড়ি ও স্থাপনায় আঘাত হানে।
বিস্ফোরণের পর আগুন এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে আশপাশের প্রায় ৩০টি গাড়ি পুড়ে যায়। এছাড়া অন্তত চারটি বসতবাড়ি ও বিভিন্ন অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটও আগুনে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। আগুনের তাপ ও ধোঁয়ায় পুরো এলাকা আতঙ্কে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি করতে থাকেন। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট এসে দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
এই ঘটনায় অন্তত ১৫ জন দগ্ধ ও আহত হন। গুরুতর আহত ছয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বাকিদের স্থানীয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা যায়।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে একজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। শুক্রবার বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, গ্যাসপাম্পের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সেখানে চিকিৎসাধীন কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। তিনি বলেন, “বর্তমানে আমাদের বার্ন ইউনিটে ছয়জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে আবু তাহের ৯০ শতাংশ, রহিম ৫০ শতাংশ, সিরাজ ৪০ শতাংশ, সাকিব ৩০ শতাংশ এবং মেহেদি ও মোতাহের ২০ শতাংশ করে দগ্ধ হয়েছেন।”
আরো পড়ুনঃ কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর দুই চোখের সফল……..
তিনি আরও জানান,
গুরুতর অবস্থার কারণে প্রথম তিনজনকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে একজন রোগীকে স্বজনরা নিজ দায়িত্বে রিলিজ নিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর করেছেন। ওই রোগীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
পুরো ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা যথাযথভাবে ছিল কি না এবং নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছিল কি না। একইসঙ্গে তারা দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে যদি কোনো ধরনের অবহেলা, গাফিলতি বা নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, আহতদের চিকিৎসা সহায়তা এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর জেলায় এমন একটি দুর্ঘটনা শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, জননিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ত্রুটির বিষয়টিও সামনে এনে দিয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা—তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন হোক, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হোক।



