Uncategorized

অনৈতিকভাবে বেড়িবাঁধের গাছ কাটা: বিএনপি নেতার প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সকল পদ স্থগিত

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর এলাকায় নদীভাঙন রোধে রোপণ করা প্রায় ২০টি মেহগনি গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় জনগণের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে, নিজ বাড়িতে গাড়ি চলাচলের পথ সুগম করতে—ধাপে ধাপে এই গাছগুলো কেটে ফেলেছেন।

ঘটনার পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তার প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সকল পদ স্থগিত করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, দলীয় ব্যবস্থা যথেষ্ট কি? নাকি এবার তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে?

কী ঘটেছিল কামালপুরে?

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে নদীভাঙন রোধে এই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় তিন দশক ধরে গাছগুলো শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং বাঁধের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছিল।

অভিযোগ অনুযায়ী, জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের বাড়িতে প্রবেশের জন্য বাঁধের ওপর দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে চলাচলে অসুবিধা হওয়ায় গত ৫ আগস্টের পর থেকে একে একে গাছ কাটা শুরু হয়। সর্বশেষ ২১ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে ১০ থেকে ১২টি গাছ কেটে ফেলা হয়।

প্রতিটি গাছের আনুমানিক বাজারমূল্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। বৈদ্যুতিক করাত ব্যবহার করে গাছের গুঁড়ি কেটে ফেলা হয় এবং পরে সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হওয়ায় প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি।


অভিযুক্তের বক্তব্য

অভিযোগ অস্বীকার করে জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর বলেন,
“আমি কাটবো কেন? আমার দরকার আছে কাটার? আন্দাজে কথা বলা হচ্ছে। জায়গা ও গাছগুলো সরকারি না। প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে গাছ কেটে নিয়ে গেছে। বেড়িবাঁধ সরকারি না, অধিগ্রহণকৃতও না।”

তবে স্থানীয়দের একাংশ এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বেড়িবাঁধটি জনস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং গাছগুলো রোপণ করা হয়েছিল সরকারি উদ্যোগে।


প্রশাসনের বক্তব্য

মিঠামইন উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত বন বিভাগের কর্মকর্তা জুলফিকার জয় জানান,
বেড়িবাঁধের গাছগুলো স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় ‘খোয়াব’ নামের একটি এনজিও রোপণ করেছিল। বিষয়টি এলজিইডি ও সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীদের দায়িত্বের আওতায় পড়ে।

মিঠামইন উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকৌশলী ফয়জুর রাজ্জাক বলেন,
“১৯৯৫-১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সে সময় গাছ রোপণ করা হয়। গাছ কাটার বিষয়টি জানার পর স’মিলে গিয়ে কাঠ জব্দ করা হয়েছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”


দলীয় ব্যবস্থা বনাম আইনি প্রক্রিয়া

ঘটনার পর বিএনপির পক্ষ থেকে জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সকল পদ স্থগিত করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এতেই কি দায় শেষ?

পরিবেশ, জনসম্পদ ও নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর গাছ কেটে ফেলা শুধুই দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়; এটি জনস্বার্থবিরোধী ও সম্ভাব্যভাবে দণ্ডনীয় অপরাধও হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নিরূপণ জরুরি।


রাজনৈতিক বার্তা ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে, বিএনপি এখন কেমন রাজনীতি করতে চায়? জনসম্পদ রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণ কি তাদের অগ্রাধিকারের অংশ? দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে তারেক রহমান যে “জনমুখী ও দায়িত্বশীল রাজনীতি”-র কথা বলেন, তা মাঠপর্যায়ে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?

দলীয় নেতাকর্মীদের বোঝা উচিত ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থ। একটি রাজনৈতিক দলের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় তাদের কর্মীদের আচরণে। যদি স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে জনসম্পদ নষ্ট করা হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যক্তির নয়, পুরো দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।


পরিবেশ ও জননিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ

নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলে বেড়িবাঁধের গাছ কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়; এগুলো মাটির বাঁধ শক্ত করে, ক্ষয় রোধ করে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুরক্ষা দেয়। এ ধরনের গাছ কাটা মানে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন রোধে রোপিত গাছ কাটার ঘটনায় কঠোর নজির স্থাপন না করলে ভবিষ্যতে আরও এমন অনিয়ম ঘটতে পারে।


উপসংহার

কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের এই ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় ইস্যু নয়; এটি জনসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার একটি বড় পরীক্ষা। দলীয় পদ স্থগিত একটি সূচনা মাত্র এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, আইনি পদক্ষেপ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়)।

রাজনীতি যদি জনকল্যাণের জন্য হয়, তবে জনসম্পদের ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখন দেখার বিষয়-দল ও প্রশাসন কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে বিষয়টি মোকাবিলা করে এবং আইনের শাসন কতটা নিশ্চিত করা হয়।

BartaNow - বার্তানাও

বার্তানাও: বিশ্ব সংবাদ, সহজ ভাষায়। খবর জানো, সংযোগে থাকো।

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button