১৯৭১ সালে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বীরত্বগাথা
পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের শেষ চেষ্টা কীভাবে সোভিয়েত হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হলো এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ত্বরান্বিত হলো।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। তবে এই বিজয়ের ঠিক কয়েকদিন আগে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়েছিল এক ভয়াবহ উত্তেজনা। যখন পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য এক মরিয়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জারের নির্দেশে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স (Task Force 74) বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হয়। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে রাখা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া।
সপ্তম নৌবহরের অভিযান ও মার্কিন অভিসন্ধি
৯ ও ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরী ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ (USS Enterprise)-এর নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল যে, তারা পূর্ব পাকিস্তানে আটকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য এই নৌবহর পাঠিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের পরাজয় বিলম্বিত করা এবং সম্ভব হলে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। নিক্সন ও কিসিঞ্জার চেয়েছিলেন ভারতকে এই বার্তা দিতে যে, তারা যদি যুদ্ধ বন্ধ না করে তবে তাদের মার্কিন শক্তির মুখোমুখি হতে হবে।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি নিয়ে কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তা আজও এদেশের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জানতেন কারা আমাদের প্রকৃত বন্ধু আর কারা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আমাদের দমাতে চেয়েছিল।’
সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ
মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করার উপক্রম করলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন মোড় আসে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিল। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০ বছরের মৈত্রী চুক্তির আওতায় সোভিয়েত নৌবাহিনী ভারতের সাহায্যে এগিয়ে আসে। মার্কিন টাস্কফোর্স ৭৪-কে রুখে দিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের ১০ম অপারেটিভ ব্যাটল গ্রুপকে বঙ্গোপসাগরের অভিমুখে পাঠায়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক সাবমেরিন এবং রণতরীগুলো যখন মার্কিন নৌবহরের গতিপথ অনুসরণ করতে শুরু করে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে যে তারা সরাসরি সংঘর্ষে জড়ালে বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই সময়োচিত ও দৃঢ় হস্তক্ষেপই মূলত সপ্তম নৌবহরকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। ফলে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের পথ প্রশস্ত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। আপনি যদি সেই সময়ের আন্তর্জাতিক কূটনীতি সম্পর্কে আরও জানতে চান তবে এখানে বিস্তারিত পড়তে পারেন।
বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবসময়ই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে পশ্চিমারা এদেশের শোষিত মানুষের বদলে একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন করেছিল। এই ঐতিহাসক প্রেক্ষাপটই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁরই উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিদেশি শক্তির রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেন না। বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি আজও বাংলাদেশের গর্ব।
আব্দুল মাবুদ তাঁর লেখায় আরও উল্লেখ করেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সবসময়ই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। কারণ তাঁরা নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে ১৯৭১ সালে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বাংলার সাধারণ মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে চেয়েছিল। বর্তমান সময়েও যখন বিদেশি শক্তি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে, তখন এই ইতিহাসই আমাদের শক্তি জোগায়।’
ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা
১৯৭১ সালের সপ্তম নৌবহরের ঘটনাটি কেবল যুদ্ধের একটি অংশ নয়, বরং এটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। মার্কিনীদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও অকৃত্রিম বন্ধুর সমর্থন থাকলে কোনো পরাশক্তিই বিজয়ের পথ রোধ করতে পারে না। আজকের বাংলাদেশে যখন উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে, তখন ইতিহাসের এই শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান যে কতটা সংবেদনশীল, তা ১৯৭১ সালের সেই উত্তপ্ত বঙ্গোপসাগর থেকেই আন্দাজ করা যায়।
পরিশেষে, আব্দুল মাবুদের এই বিশ্লেষণটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মুক্তি ও স্বাধীনতার পথ মসৃণ ছিল না। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অনড় থেকে বঙ্গবন্ধু যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সেই পথেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সপ্তম নৌবহরের ব্যর্থতা কেবল মার্কিন পরাজয় ছিল না, তা ছিল বাঙালির সাহস ও সোভিয়েত বন্ধুত্বের চূড়ান্ত বিজয়।



